
বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া), ৩০ অক্টোবর (এপি):
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক করতে যাচ্ছেন। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির নেতাদের জন্য এটি এক সুযোগ, দীর্ঘ কয়েক মাসের বাণিজ্যিক অস্থিরতার পর সম্পর্ক স্থিতিশীল করার।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে শুল্ক আরোপের যে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছেন এবং তার প্রতিক্রিয়ায় চীনের বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ, সেই দুই দিক মিলিয়ে বৈঠকটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। উভয় দেশই এখন বুঝতে পারছে যে অতিরিক্ত সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে পারে এবং তা তাদের নিজ নিজ অর্থনীতির ক্ষতিও করতে পারে।
বৈঠকের আগে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প সম্প্রতি চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ আমদানি কর আরোপের যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে, চীনও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা বিরল খনিজ রপ্তানির সীমাবদ্ধতা কিছুটা শিথিল করতে পারে এবং আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন কিনতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের জানান, তিনি এই বছর চীনের ওপর যে ফেন্টানিল-সম্পর্কিত শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা কমানোর কথা ভাবছেন।
তিনি বলেন, “আমি আশা করছি এটি কমাব, কারণ তারা ফেন্টানিল সমস্যায় আমাদের সহায়তা করবে বলে বিশ্বাস করি।” পরে তিনি যোগ করেন, “চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই ভালো।” বৈঠকটি বুসান শহরে সকাল ১১টায় শুরু হবে, যা গিয়ংজু থেকে প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত, যেখানে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন (APEC) সম্মেলনের মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে।
বুধবার রাতে এপেক নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজের সময় ট্রাম্প মাইক্রোফোনে ধরা পড়েন বলছেন, শি-এর সঙ্গে তার বৈঠক “তিন-চার ঘণ্টা” চলবে, এরপর তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে যাবেন।
এই সপ্তাহের শুরুতে উভয় দেশের কর্মকর্তারা কুয়ালালামপুরে মিলিত হন তাদের নেতাদের বৈঠকের প্রস্তুতির জন্য। বৈঠকের পর চীনের শীর্ষ বাণিজ্য আলোচক লি চেংগ্যাং বলেন, তারা “প্রাথমিক ঐকমত্যে” পৌঁছেছেন। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও বলেন, “একটি খুব সফল কাঠামো তৈরি হয়েছে।” এই সংবাদ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনেছে, এবং মার্কিন শেয়ারবাজারও সম্ভাব্য চুক্তির আশায় উর্ধ্বমুখী।
তবে, যতই সৌহার্দ্যের বার্তা দেওয়া হোক না কেন, ট্রাম্প ও শি এখনো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছেন — কারন তাদের দেশ দুটি আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উৎপাদন শিল্প এবং ইউক্রেন যুদ্ধে প্রভাব বিস্তারে নেতৃত্ব পেতে চাইছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি এই বৈঠকে তাইওয়ানের নিরাপত্তা ইস্যু তুলবেন না।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিসের চীনা কর্মসূচির পরিচালক ক্রেইগ সিঙ্গলটন বলেন, “এই প্রস্তাবিত চুক্তি সারা বছরের একই ধাঁচে হচ্ছে — স্বল্পমেয়াদী স্থিতিশীলতাকে কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে উপস্থাপন করা। উভয় দেশই শুধু অস্থিরতা সামলাতে সাময়িক সহযোগিতা করছে, গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিন্তু অটুট।”
ট্রাম্পের জন্য চাপের অস্ত্র হলো শুল্ক। এই বছর চীনের ওপর ৩০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ হয়েছে, যার মধ্যে ২০ শতাংশ ফেন্টানিল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই শুল্কের হার প্রায়ই বদলেছে। এপ্রিলে তিনি তা ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেন, কিন্তু বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করেন।
এই মাসের শুরুতে, শি-এর সঙ্গে বৈঠকের আগে, ট্রাম্প চীনের বিরল খনিজ রপ্তানির সীমাবদ্ধতার কারণে ১০০ শতাংশ আমদানি করের হুমকি দেন।
চীনেরও হাতিয়ার আছে — কারণ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ উৎপাদক ও প্রক্রিয়াকরণকারী, যা যুদ্ধবিমান, রোবট, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি সামগ্রী তৈরিতে অপরিহার্য।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের ঠিক আগে, ৯ অক্টোবর, চীন তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে, যা দেখায় যে উভয় দেশ বারবার একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং পরে আলোচনা শুরু হলে কিছুটা ছাড় দেয়।
বৈঠকের পরের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ফিরবেন, আর শি দক্ষিণ কোরিয়ায় থেকে যাবেন এবং শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এপেক সম্মেলনে অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
টিডি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জে ট্রুসডেল বলেন, “শি এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন চীনকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করার, এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিতে হতাশ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার।”
