রাতারাতি আলোড়ন তোলা সিনেমা লাপাত্তা লেডিজ শুধু সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেনি, বরং এর তরুণ মুখ্য চরিত্রাভিনেত্রী নিতাংশি গোয়েলকেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বলিউডের নতুন ‘আদর্শ বউমা’ হিসেবে তার স্থান পাকা করে ফেলেছেন তিনি। পুরস্কারজয়ী এই পারফরম্যান্সের পর গোয়েল এখন শুধু অভিনয়ের জন্য নয়, তার আত্মবিশ্বাসী এবং মার্জিত ব্যক্তিত্বের জন্যও দর্শকের মন জয় করছেন।
নোয়েডা থেকে সিলভার স্ক্রিনের যাত্রা
২০০৭ সালের ১২ জুন উত্তরপ্রদেশের নোয়েডায় জন্ম নেন নিতাংশি গোয়েল। ছোটবেলাতেই বাবা-মা নীতিন ও রাশি গোয়েল তাকে নিয়ে মুম্বাই পাড়ি দেন অভিনয়ের স্বপ্নে। শিশু মডেল হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরে ইশকবাজ, নাগার্জুনা: এক যোদ্ধা, ও থাপকি পেয়ার কি মতো টিভি সিরিয়ালে কাজ করেন। এই অভিজ্ঞতাই তাকে বড়পর্দার জন্য প্রস্তুত করে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে লাপাত্তা লেডিজ-এ ফুল কুমারীর চরিত্রে তার অভিষেক, যেখানে তিনি এক গ্রামীণ নববধূর ভূমিকায় সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথার বিরুদ্ধে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প ফুটিয়ে তোলেন।
সমালোচকদের প্রশংসা ও পুরস্কার ঝড়
কিরণ রাও পরিচালিত এবং আমির খান প্রোডাকশন প্রযোজিত লাপাত্তা লেডিজ-এ গোয়েল ছাড়াও অভিনয় করেছেন প্রতিভা রন্তা, স্পর্শ শ্রীবাস্তব, ছায়া কদম ও রবি কিশন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার এবং ২০২৪ সালের মার্চে মুক্তি পাওয়া ছবিটি প্রশংসিত হয়েছে এর সূক্ষ্ম গল্প বলার ধরন এবং নারীবাদী বার্তার জন্য। ২০২৫ সালের ৮–৯ মার্চ জয়পুরে অনুষ্ঠিত ২৫তম IIFA অ্যাওয়ার্ডসে সিনেমাটি ১০টি বিভাগে পুরস্কার জিতে, যার মধ্যে ছিল সেরা ছবি, সেরা পরিচালক (কিরণ রাও), এবং সেরা অভিনেত্রী নিতাংশি গোয়েল। নিতাংশির এই জয় ছিল ঐতিহাসিক—তিনি IIFA-র ইতিহাসে কনিষ্ঠতম বিজয়ীদের মধ্যে একজন।
কেন তিনি ‘আদর্শ বউমা’?
‘আদর্শ বউমা’ উপাধিটি তার অভিনয়কুশলতা ছাড়াও সামাজিক অভিঘাতের জন্য প্রযোজ্য। ‘ফুল’ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন ভারতীয় ঐতিহ্যকে সম্মান জানান, তেমনি নিজের অবস্থান থেকে সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেন। তার এই চরিত্র বহু মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে আত্ম-পরিচয় ও স্বাধীনতার ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। নিজের জীবনযাত্রা—একজন শিশু শিল্পী থেকে মাত্র এক ছবিতে জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী হয়ে ওঠা—একটা প্রতিকী পথচলা, যা দর্শকের মনে দাগ কেটেছে।
অভিনয় ছাড়াও ফ্যাশন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
নিতাংশি গোয়েলের উত্থান শুধুমাত্র বলিউডে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন, ল’অরিয়াল প্যারিসের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে, যেখানে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ অভিনেত্রী যিনি রেড কার্পেটে হাঁটেন। তাকে ফ্যাশনের নতুন মুখ বলেও বিবেচনা করা হচ্ছে। মুম্বাই ফ্যাশন উইকে তার ডিজাইনার লেহেঙ্গা পরে উপস্থিতি হোক কিংবা “Waves 2025” শাড়িতে লুকে, কিংবা ম্যাগাজিন কভারে—তার স্টাইল ও ফ্যাশন সেন্স তাকে তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস করে তুলেছে।
জেন-জি প্রজন্মের নারীবাদ ও প্রতিনিধিত্বের মুখ
জেন-জি প্রজন্মের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে, তিনি কেবল অভিনয়ে নয়, বরং নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রেরণাদায়ক বক্তব্যের মাধ্যমেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণীদের উদ্দেশ্যে তিনি স্বপ্ন দেখার ও নিজেকে গড়ে তোলার বার্তা দেন—যেটা তার ‘ফুল’ চরিত্রের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমালোচক সাইবল চ্যাটার্জির মতে, তার সংলাপ বলার ধরণ ও আবেগ প্রকাশ এতটাই স্বাভাবিক, যে তিনি একসাথে কোমলতা ও আশার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
ভবিষ্যতের দিকে: গড়ে উঠছে এক নতুন তারকা
২০২৫ সালের জুনে ১৮ বছরে পা দিয়েছেন নিতাংশি গোয়েল। লাপাত্তা লেডিজ এখন অস্কারের জন্য জমা পড়েছে এবং কান ফেস্টিভালেও তার উপস্থিতি আলোচনায় এসেছে। ফলে, তার ক্যারিয়ারের উত্থান থামার কোনো লক্ষণ নেই। আগামী দিনে আরও নতুন চরিত্র, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি—সব কিছুতেই তার সম্ভাবনা অসীম। শিশু শিল্পী থেকে আধুনিক ভারতীয় তারকায় রূপান্তর—এই গল্প এখনো লিখে চলেছেন তিনি।
– সোনালি

