ভারতের ২০৪৭ সালের মধ্যে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ৮ গিগাওয়াট থেকে ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষ, যা দেশের পরিচ্ছন্ন শক্তি লক্ষ্যের অংশ, পারমাণবিক শক্তি আইন—বিশেষ করে সিভিল লাইয়াবিলিটি ফর নিউক্লিয়ার ড্যামেজ অ্যাক্ট (CLNDA), ২০১০ এবং এটমিক এনার্জি অ্যাক্ট (AEA), ১৯৬২—সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এই সংশোধনের ঘোষণা দেন, যা মূলত বেসরকারি খাতকে পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেবে, বিশেষ করে স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR) প্রযুক্তিতে। এই উদ্যোগে ২০,০০০ কোটি টাকা গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য রয়েছে।
সংশোধনের পক্ষে যুক্তি:
বর্তমান CLNDA-র কঠোর দায়িত্ব বিধান, যেখানে সরবরাহকারী ও অপারেটর উভয়েই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, বিদেশি ফার্ম যেমন জেনারেল ইলেকট্রিক ও ওয়েস্টিংহাউসের জন্য বাধা সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী (CSC) অনুযায়ী দায়িত্ব শুধুমাত্র অপারেটরের ওপর থাকে, কিন্তু ভারতের আইন সরবরাহকারীদের অপ্রতিম দায়িত্ব দেয়, যা জৈতাপুর ও কোভাদা প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্প স্থবির করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশোধন ছাড়া বিদেশি অংশগ্রহণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর সম্ভব নয়।
নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ:
সমালোচকরা সতর্ক করেছেন যে, CLNDA সংশোধন করলে দায়িত্বের ঝুঁকি কমে যাবে এবং এটি ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির মতো দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে পরীক্ষামূলক SMR প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রাক্তন পারমাণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অনিল কাকোডকর বলছেন, “অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে সংশোধন করা উচিত নয়” এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কারণ বর্তমান এনার্জি নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (AERB) যথেষ্ট স্বতন্ত্র নয়। এছাড়া বিদেশি ফার্মরা উন্নত SMR প্রযুক্তি শেয়ার করবে কিনা তাও সন্দেহজনক।
বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতার ভারসাম্য:
সরকার সংশোধনের মাধ্যমে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করতে চায়, যা বর্তমানে NPCIL-এর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে। তবে শ্যাম সরণের মত অভিজ্ঞ কূটনীতিক মনে করেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। দেশের নিজস্ব ২২০ মেগাওয়াট PHWR-ভিত্তিক SMR যথেষ্ট হতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন।
গুরুত্বপূর্ণ মোড়:
এই সংশোধন ভারতীয় পারমাণবিক শক্তি খাতের জন্য যুগান্তকারী হতে পারে, দীর্ঘদিন আটকে থাকা প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিয়ে আসতে পারে এবং দেশকে শক্তিশালী শক্তি নিরাপত্তা দেবে। তবে ভোপাল পরবর্তী কঠোর দায়িত্ব কাঠামো কমজোরি করার ঝুঁকি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সফরের পর এই সংশোধনের কাঠামো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
উপসংহার:
ভারতকে অবশ্যই নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে পারমাণবিক শক্তি আইন সংশোধন করতে হবে, যাতে ২০৪৭ সালের ১০০ গিগাওয়াট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় এবং দেশের পরিচ্ছন্ন শক্তি অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হয়।
– Manoj H.

