
নন্দীগ্রাম, ১৬ জানুয়ারি (পিটিআই) — পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন আর কয়েক মাস দূরে। তার আগেই নন্দীগ্রামে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে প্রতি বছর ‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্য শিবির আয়োজন করা হবে এবং বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর শক্ত ঘাঁটিতেই তাঁকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান।
৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই স্বাস্থ্য শিবিরগুলি। যদিও এগুলি অভিষেকের ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে পরিচালিত বড় আকারের সেবাশ্রয় কর্মসূচির তুলনায় ছোট, তবু এগুলির জন্য উল্লেখযোগ্য খরচ হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্রের দুই ব্লকে শিবির পরিদর্শনের পর অভিষেক বলেন, “নন্দীগ্রামে প্রতি বছর সেবাশ্রয় হবে। শুধু আগামী বছর নয়, প্রতি বছর। এবার দুটি মডেল শিবির হয়েছে। ভবিষ্যতে সব ১৭টি এলাকায় হবে। কারও যদি ক্ষমতা থাকে, আটকানোর চেষ্টা করে দেখুক।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘোষণা শুধুমাত্র স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে নয়, বরং নন্দীগ্রামে রাজনৈতিক জমি পুনর্দখলের স্পষ্ট বার্তা। নন্দীগ্রাম পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি আসন।
২০০৭ সালের ভূমি আন্দোলন এই নন্দীগ্রাম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যের রাজনীতিতে গণআন্দোলনের মুখ হিসেবে তুলে ধরে এবং শেষ পর্যন্ত ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পথ প্রশস্ত করে। আবার ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই একই আসনে তিনি তাঁর প্রাক্তন সহযোগী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন।
২০২৬ সালের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নন্দীগ্রামকে ঘিরে তৃণমূলের সক্রিয়তা বাড়ছে। বিজেপি এই আসনকে বাংলায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, আর সেই প্রচেষ্টার পাল্টা জবাব হিসেবেই তৃণমূলের এই উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। কটাক্ষ করে তিনি বলেন, একদিন হয়তো শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারের সদস্যদেরও সেবাশ্রয়ের পরিষেবা নিতে হতে পারে।
শিবিরগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে—এই অভিযোগ অস্বীকার করে অভিষেক জানান, নন্দীগ্রামের বাসিন্দারা ‘এক ডাকে অভিষেক’ হেল্পলাইনের মাধ্যমে বারবার অনুরোধ করেছিলেন বলেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক হলে আমরা হারানো ৭৭টি আসনেই শিবির করতাম। নন্দীগ্রামের মানুষ চেয়েছেন, তাই করেছি।”
শিবিরের অর্থের উৎস নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশ্নের জবাবে অভিষেক কড়া সুরে বলেন, “হিসাব চাওয়ার তিনি কে? প্রয়োজনে আয়কর বিভাগ বা যে কোনও আইনগত সংস্থার কাছে আমরা সব তথ্য জমা দেব। শুধু ‘অধিকারী’ পদবি থাকলেই বিশেষ অধিকার পাওয়া যায় না।”
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শুভেন্দু অধিকারী সেবাশ্রয় কর্মসূচিকে ‘লোকদেখানো’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে শুধু প্যারাসিটামল ও ওআরএস বিলি করতেই নন্দীগ্রাম বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, নন্দীগ্রামের মানুষ সারা বছর যাঁরা পাশে থাকেন, তাঁদের ভালোভাবেই চেনেন।
এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের পাশাপাশি সেবাশ্রয় কর্মসূচি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন মেটানোর চেষ্টাও বলে মনে করছেন অনেকে। বৃহস্পতিবার দুই ব্লকের শিবির আয়োজনে সমন্বয়ের অভাব চোখে পড়ে।
প্রতীকী দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০০৭-০৮ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে শিবিরের উদ্বোধন। এতে আবেগের প্রকাশ দেখা গেলেও রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট ছিল না।
নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, নন্দীগ্রাম আবারও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা স্পষ্ট—তৃণমূল নন্দীগ্রামকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। তবে সেবাশ্রয় কর্মসূচি শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত প্রভাবকে কতটা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিভাগ: ব্রেকিং নিউজ
এসইও ট্যাগ: #স্বদেশি, #সংবাদ, ভোটের আগে নন্দীগ্রামে স্বাস্থ্য শিবিরের মাধ্যমে শুভেন্দুকে চ্যালেঞ্জ অভিষেক
