স্ট্যানলি ফাং শুই-ফান, হংকংয়ের কমেডি কিংবদন্তি, ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত: সাড়ে পাঁচ দশকের হাসির পর শেষ অভিনয়

Veteran actor and director Stanley Fung Shui-fan

বিখ্যাত হংকং অভিনেতা ও পরিচালক স্ট্যানলি ফাং শুই-ফান, যিনি ক্যান্টনিজ সিনেমার সোনালি যুগে তাঁর নিখুঁত কমিক টাইমিং এবং স্মরণীয় চরিত্রগুলোর জন্য সুপরিচিত ছিলেন, ৩১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তাইওয়ানে ৮০ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাইওয়ানেই বাস করছিলেন। নিউ তাইপেই সিটির কাউন্সিলর সাই শু-চুন সামাজিক মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রথমে শেয়ার করেন, পরে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু স্যাং সিং-মিং এর হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধাবার্তার মাধ্যমে টিভিবি এন্টারটেইনমেন্ট নিউজ এই খবর নিশ্চিত করে। তাঁর মৃত্যু ঘটে ঠিক কয়েকদিন পরেই যখন তিনি অভিনেতা বেঞ্জ হুই-এর প্রয়াণে লিখেছিলেন একটি বেদনাভরা বিদায়বার্তা: “প্রিয় ভাই, ওখানে আমার জন্য অপেক্ষা করো।” দীর্ঘ ১৩৫টি চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারে ফাং-এর ডেডপ্যান হাস্যরস বিশ্বের দর্শকদের মন মাতিয়েছে, রেখে গেছে হংকংয়ের কমেডির ইতিহাসে অমলিন ছাপ—যে সময়ে বৈশ্বিক বিনোদন জগত এখনও উদ্‌যাপন করে চলেছে তাঁর অনন্য আকর্ষণকে।

হাসির জীবন, নীরব সংগ্রামের শেষ অধ্যায়

ফাং-এর মৃত্যুর আগে ছিল স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা; মে ২০২৫-এ তিনি জানিয়েছিলেন যে তাঁকে দুই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছে এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায় অক্সিজেন মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। ১৯৮৯ সালে তাইওয়ানে চলে যাওয়ার পর তিনি আধা-অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন। মাঝেমধ্যে স্মৃতিমাখা পোস্ট শেয়ার করতেন—যেমন বেঞ্জ হুইকে তাঁর শেষ শ্রদ্ধা, যেখানে নিজের ভঙ্গুরতার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন: “খারাপ লাগছে যে সে সত্যিই আমার আগে চলে গেল।”

১ জুন ১৯৪৪ সালে গুয়াংডংয়ের ফোশানে জন্ম নেওয়া ফাং ছয় বছর বয়সে হংকংয়ে চলে আসেন। ১৯৬৭ সালে পরিচালক চোর ইউয়েনের To Rose with Love চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু। ১৯৭৪ সালে তিনি ম্যান্ডারিন ড্রামা The Looks of Hong Kong পরিচালনার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে অভিষেক করেন, তবে ১৯৮০-এর দশকের কমেডি ঢেউ তাঁকে এনে দেয় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা—স্যামো হুং ও জ্যাকি চ্যানের মতো তারকাদের সঙ্গে কাজ করে।

ফাং-এর চিরসবুজ উত্তরাধিকার: ‘লাকি স্টার্স’ ও তার পরেও

লাকি স্টার্স সিরিজে তাঁর প্রতিভা সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে—

My Lucky Stars (1985), Lucky Stars Go Places (1986) এবং The Romancing Star (1987)-এ তাঁর দুর্ভাগা সাধারণ মানুষের চরিত্র দর্শকদের হাসিতে ভরিয়ে তুলেছিল—বিশেষ করে হলুদ স্কুল বাসের সেই দৃশ্য মালয়েশিয়ান ভক্তদের কাছে আজও প্রিয় স্মৃতি।

“সেভেন লিটল ফর্চুনস”-এর একজন সদস্য হিসেবে তিনি ওয়াং জিং-এর ফার্স ধারার চলচ্চিত্রে যেমন The Best Partners (1988) এবং The Crazy Companies (1988)-এ ডেডপ্যান সংলাপের বিপরীতমুখী ব্যঙ্গাত্মক রসবোধ দেখিয়েছেন—যার ম্যান্ডারিন ডাবিং-এর ফলমূলভিত্তিক গালাগালি তাইওয়ানে স্ল্যাং হয়ে ওঠে।

যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি ওয়াং জিং-এর কিছু “লজ্জাজনক” চলচ্চিত্রের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর বহুমুখিতা তাঁকে Bandit Queen (1994)-এর মতো নাটকীয় সিনেমা এবং টিভিবি সিরিজেও সফলতা দিয়েছে।

১০টি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও ৩টি প্রযোজনা করে ফাং তৈরি করেছেন এক স্থায়ী প্রভাব, যে স্টাইল প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে—যখন হংকংয়ের সিনেমা ৫ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাজার কাঁপাচ্ছিল।

শ্রদ্ধা নিবেদন: হাসির কারিগরকে কোটি মানুষের বিদায়

হংকংয়ের বিনোদন দুনিয়া মুহূর্তেই শোকপ্রকাশে ভরে ওঠে। টিভিবির পোস্টে হাজারো শোকবার্তা জমা হয়। স্যাং লিখেছেন,

“প্রিয় বন্ধু কুয়ান গর—ফাং শুই-ফান, শান্তিতে ঘুমাও! তুমি চিরকাল স্মরণীয়।”

সহকর্মী এরিক স্যাংও লিখেছেন, “এক সত্যিকারের কমেডি মাস্টার খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।”

বিশ্বজুড়ে অনুরাগীরা এক্স-এ #StanleyFungRIP হ্যাশট্যাগে ভিডিও শেয়ার করেছেন—যেমন Magnificent Scoundrels (1991)-এ স্টিফেন চাউয়ের সঙ্গে তাঁর মজার কথোপকথন—যার ভিউ ছুঁয়েছে ৫ লাখ।

৭৮০ ভাষার এশিয়ান পপ সংস্কৃতির বিশাল পরিসরে তাঁর প্রভাব আজও বেঁচে আছে—মালয়েশিয়ার সিনেমা হল থেকে নেটফ্লিক্স রিভাইভাল পর্যন্ত—যেখানে কমেডির নিরাময়শক্তি আবার স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর অবদান।

শেষ নেমে যাওয়া পর্দা: হাসির প্রতিধ্বনি অমর

স্ট্যানলি ফাং শুই-ফানের বিদায় কোনো সমাপ্তি নয়—এ এক আনন্দময় এনকোর। তাঁর খলচরিত্রের ভোঁতা নাকের হাসি কিংবা চিরচেনা বোকাসোকা বন্ধু চরিত্রগুলো যখন পর্দায় বাঁচে, প্রশ্ন তোলে—হাসি কি দুঃখকে অতিক্রম করতে পারে?

তাঁর চিরন্তন হাসিমাখা চোখের চাহনি বলেই দেয়—হ্যাঁ পারে।

তাই সিনেমার বিশাল রসিকতাময় পর্দায় তাঁর রেখে যাওয়া হাসি থেকে যাবে চির অমলিন।

— মনোজ হ