কলকাতা, ২৯ ডিসেম্বর (পিটিআই) — কাঁচা পাটের তীব্র ঘাটতি, রেকর্ড উচ্চ দাম এবং খাদ্যশস্য প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর বাড়তি নির্ভরতার কারণে ২০২৫ সালে পাট শিল্প আবারও সংকটের এক বছর অতিক্রম করেছে, যা গোটা খাতকে অস্থির করে তুলেছে।
বছরের শুরুতে কাঁচা পাটের প্রাপ্যতা ও আইনগত প্যাকেজিং চাহিদার মধ্যে যে অমিল দেখা দিয়েছিল, তা ডিসেম্বরের মধ্যে গভীর সংকটে রূপ নেয়। এর বড় কারণ হিসেবে কৃষকদের ভুট্টার মতো বিকল্প ফসলে ঝুঁকে পড়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ফলে পাট চাষ কমেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত খরিফ মরসুমে পাটের আবাদ ছিল প্রায় ৫.৫৬ লক্ষ হেক্টর, যা স্বাভাবিক প্রায় ৬.৬০ লক্ষ হেক্টরের তুলনায় কম এবং আগের বছরের তুলনাতেও কম।
এটি ঘটেছে এমন সময়ে, যখন সরকার ২০২৫-২৬ মরসুমের জন্য কাঁচা পাটের (টিডি-৩ গ্রেড) ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) প্রতি কুইন্টাল ৫,৬৫০ টাকা নির্ধারণ করেছিল।
সরবরাহ সংকট বাড়ায় খাদ্যশস্য সংগ্রহে পাটের বস্তার ব্যবহার শিথিল করতে সরকার ক্রমশ প্লাস্টিক বিকল্পের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে শ্রমনির্ভর এই শিল্প উৎপাদন কমানো, মিল বন্ধ ও আর্থিক চাপের মুখে পড়ে, বলে মিলমালিকদের এক সংগঠনের কর্মকর্তারা জানান।
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার এই শিল্পে সরাসরি প্রায় ২.৪ লক্ষ মিলকর্মী ও প্রায় পাঁচ লক্ষ কৃষক যুক্ত।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রে ছিল কাঁচা পাটের দামের নজিরবিহীন বৃদ্ধি। ২০২৪-২৫ ফসল বছরে (জুলাই-জুন) যেখানে দাম নেমে গিয়েছিল প্রতি কুইন্টাল প্রায় ৪,৭০০ টাকায়, সেখানে চলতি মাসে একাধিক বাজারে তা ১১,০০০ টাকা ছাড়িয়েছে। শিল্পমহলের মতে, এটি জল্পনাজনিত নয়, বরং প্রকৃত ঘাটতির প্রতিফলন।
খাতের অংশীদাররা জানান, গত ১৫ মাসের চরম মূল্য ওঠানামাই বর্তমান সংকটকে রূপ দিয়েছে।
জুট বেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা ওম প্রকাশ সোনি বলেন, “২০২৪-২৫ ফসল বছরে সরকারি অর্ডার কম থাকায় দাম নেমে যায় প্রতি কুইন্টাল ৪,৭০০ টাকায়। এরপর ২০২৫-২৬ মরসুমে আবাদ ও উৎপাদন হঠাৎ কমে যাওয়ায় দাম রেকর্ড ১১,০০০ টাকায় পৌঁছেছে।”
বছরের পর বছর এমএসপির নিচে দাম থাকায় কৃষকরা ধীরে ধীরে ভুট্টার মতো ফসলে ঝুঁকেছেন, যেখানে পোল্ট্রি ফিড ও ইথানল খাত থেকে ভালো চাহিদা ও নিশ্চিত বাজার রয়েছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, পাটের প্রতি কৃষকদের আস্থা দুর্বল হওয়ার সময়েই ভুট্টা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে।
দাম কম থাকার সময়ে জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (জেসিআই)-র বিলম্বিত ও সীমিত ক্রয়ও পাট চাষে আগ্রহ কমিয়েছে, তারা যোগ করেন।
সরকারি তথ্য ও ২০২৫ সালের স্যাটেলাইটভিত্তিক মূল্যায়নে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের কিছু অঞ্চলে ফসলের ধরনে স্পষ্ট পরিবর্তন ধরা পড়েছে।
জুট প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালস (জেপিএম) আইনের অধীনে খাদ্যশস্যের একটি বড় অংশ পাটের বস্তায় প্যাক করা বাধ্যতামূলক, যার দাম প্রতি মাসে জুট কমিশনারের দপ্তর নির্ধারণ করে। দীর্ঘদিন ধরে এই কস্ট-প্লাস ব্যবস্থায় কৃষক, মিল ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং—সবকিছুর ভারসাম্য বজায় ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে এই ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে।
সরকারি পূর্বাভাসে ফসল ভালো দেখালেও বাস্তবে পাটের আগমন কমই ছিল। মিলগুলো চাহিদা কমাতে উৎপাদন কমালেও দাম বাড়তেই থাকে, যা প্রকৃত ঘাটতির ইঙ্গিত দেয় বলে শিল্পমহল জানায়।
সরবরাহ সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট হয় সরকারের তৃতীয় সংশোধিত খাদ্যশস্য প্যাকেজিং পরিকল্পনায়। প্রায় ১৯ লক্ষ বেলের চাহিদার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত পাট বরাদ্দ ছিল মাত্র ৭.৮ লক্ষ বেল।
ফলে খরিফ বিপণন মরসুম (কেএমএস) ২০২৫-২৬ ও রবি বিপণন মরসুম (আরএমএস) ২০২৬-২৭-এর বড় অংশে সরকার এইচডিপিই ও পিপি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
পাটকলগুলোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক আঘাত হানে। সরকারি মূল্য নির্ধারণের সূত্রে ধরা কাঁচামালের দামের চেয়ে প্রকৃত দাম অনেক বেশি হওয়ায় খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ২০২৬ সালের জানুয়ারির জন্য নতুন পাটের বস্তা সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
এক কর্মকর্তা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব ভারতের মিলগুলোতে শিফট ও কাজের দিন কমানো হয়েছে। বহু ইউনিট শুধু পুরনো অর্ডার মেটাতে চলছে। হাজার হাজার শ্রমিকের কাজের ধারাবাহিকতা গুরুতরভাবে বিপন্ন।”
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৮ ডিসেম্বর জুট কমিশনার পদ্মিনী সিংলা কাঁচা পাট মজুতের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেন। তবে শিল্প পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতির কারণে এই নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ দাম কমাতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রাক্তন আইজেএমএ চেয়ারম্যান সঞ্জয় কাজারিয়া সংকটকে “নীতিগত সমন্বয়ের ব্যর্থতা” বলে উল্লেখ করে বলেন, “যখন কাঁচা পাট এমএসপির নিচে বিক্রি হচ্ছিল, তখন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন সরবরাহ কমে গিয়ে কিছু জায়গায় দাম ১১,৫০০ টাকা ছাড়িয়েছে—ফলে বাধ্য হয়ে প্লাস্টিকের দিকে ঝোঁক বাড়ানো হচ্ছে।”
বিভাগ: ব্রেকিং নিউজ
SEO ট্যাগস: #স্বদেশি, #নিউজ, ২০২৫: কাঁচামালের সংকট ও দামের ঊর্ধ্বগতিতে চাপে পাট শিল্প

