প্রাডার ছোঁয়ায় ১.২ লক্ষ টাকার ‘কোলাপুরি’: কৃতিত্ব কোথায়, প্রশ্ন তোলেন কর্মী ও শিল্পীরা

নয়াদিল্লি, ২৯ জুন (পিটিআই) — সাধারণ কোলাপুরি চপ্পল, যা বহু মানুষের কাছে সাশ্রয়ী অথচ আভিজাত্যপূর্ণ জাতীয় পোশাকের অংশ, এবার মিলানের বিলাসবহুল ফ্যাশন র‍্যাম্পে উঠে এল প্রাডার নতুন পরিচয়ে—“লেদার ফ্ল্যাট স্যান্ডাল” নামে, যার দাম ১.২ লক্ষ টাকা! মুহূর্তেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

জিআই-ট্যাগযুক্ত এই ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে ইতালিয়ান বিলাসবহুল ব্র্যান্ড প্রাডা তাদের স্প্রিং/সামার ২০২৬ শো-তে তুলে ধরার পর, সাংস্কৃতিক চুরি ও শিল্পীদের প্রাপ্য স্বীকৃতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ডিজাইনার ও সমাজকর্মী লায়লা ত্যাবজি পিটিআই-কে বলেন, “প্রাডা যেভাবে ভারতীয় ও ঐতিহ্যবাহী কিছু দখল করেছে—কোনও স্বীকৃতি না দিয়ে—তা অত্যন্ত হতাশাজনক ও অপমানজনক। এটাই আমাদের দেশের ঐতিহ্যকে আমরা কতটা অবহেলা করি, তার প্রতিচ্ছবি। বিশ্ব সেটাকেই বিলাসবহুল পণ্যে রূপান্তর করছে।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের অসাধারণ দক্ষতা ও জ্ঞানকে আমাদের স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও গর্বের সঙ্গে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা উচিত—না হলে অন্যরা আমাদের পরিচয় চুরি করে আমাদের কাছেই বিক্রি করবে।”

ভারতে বিতর্ক বাড়ার পর, প্রাডা জানায়, তাদের ডিজাইন “ভারতীয় হস্তনির্মিত জুতার দ্বারা অনুপ্রাণিত” এবং এই স্যান্ডাল এখনও ডিজাইন পর্যায়ে রয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হয়নি।

প্রাডার কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির প্রধান লরেঞ্জো বার্তেল্লি জানান, “আমরা দায়িত্বশীল ডিজাইন, সাংস্কৃতিক সংযোগ ও ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে সংলাপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

মহারাষ্ট্র চেম্বার অফ কমার্স, ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারের চিঠিতে শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও নৈতিক ফ্যাশন অনুশীলনের দাবি জানানো হয়।

অনেকের মতে, কোলাপুরি চপ্পলকে বিলাসবহুল ফ্যাশন হিসেবে তুলে ধরলেও, মূল শিল্পীদের কোনও স্বীকৃতি না দেওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

কোলাপুরি চপ্পল সাধারণত মহারাষ্ট্রের কোলাপুর শহর ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে হস্তনির্মিত হয়। এই শিল্পের ইতিহাস ১২শ-১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত।

রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় মুচিরা উদ্ভিজ্জ ট্যানড চামড়া দিয়ে সম্পূর্ণ হাতে তৈরি করতেন—কোনও পেরেক বা সিন্থেটিক উপাদান ছাড়াই।

এদের স্বতন্ত্র টি-স্ট্র্যাপ, সূক্ষ্ম বুনন ও খোলা আঙুলের ডিজাইন খুবই জনপ্রিয়।

২০১৯ সালে ভারত সরকার কোলাপুরি চপ্পলকে জিআই ট্যাগ দেয়, যা এই শিল্পকে অনুকরণ থেকে রক্ষা করে এবং গ্রামীণ শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তা দেয়।

জিআই বিশেষজ্ঞ গণেশ হিঙ্গারে ইতিমধ্যেই প্রাডার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “এটা শুধু চপ্পল নয়, সাংস্কৃতিক চুরি, শিল্পীদের অবমাননা ও ভারতের জিআই আইনের লঙ্ঘন। কোলাপুর নয়, গোটা ভারতবর্ষের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।”

মহারাষ্ট্রে বিজেপি সাংসদ ধনঞ্জয় মহাদিক কোলাপুরের শিল্পীদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন।

সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ—বাটা ইন্ডিয়া-ও প্রাডার এই রিব্র্যান্ডিংয়ের সমালোচনা করেছে।

বাটা ইন্ডিয়ার মার্কেটিং প্রধান দীপিকা দীপ্তি বলেন, “কোলাপুরি চপ্পল কোনও ‘ডিজাইন আবিষ্কার’ নয়—এটা জীবন্ত ঐতিহ্য। সত্যিকারের মৌলিকত্ব আসে ঐতিহ্য থেকে, বিলাসবহুল ট্যাগ থেকে নয়।”

প্রাডার এই প্রচার কোলাপুরি চপ্পলের চাহিদা হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়েছে।

জনপথ মার্কেটের পুরনো দোকানদার অশোক গ্রোভার বলেন, “এরা মার্কেটিং করে হাইপ তৈরি করে, অথচ পণ্যটা তাদের নয়। ওই চপ্পল ২-৩ হাজার টাকার বেশি নয়, আর এখানে আমি হাজার টাকায়ও বিক্রি করতে পারি না।”

শুধু কোলাপুরি চপ্পল নয়, ভারতীয় ঝোলা, যা সাধারণত ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়, সেটাই আমেরিকান সাইটে ৪,০০০ টাকায় ‘ইন্ডিয়া সুভেনির টোট’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী দোপাট্টা “স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ”, সূক্ষ্ম কারুকার্য করা লেহেঙ্গা “ওয়াই২কে ম্যাক্সি স্কার্ট” নামে বিক্রি হচ্ছে।

তবে কিছু ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই আন্তর্জাতিক মনোযোগ কোলাপুরি চপ্পলের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে সাহায্য করতে পারে।