কলকাতা, ২১ জুলাই (পিটিআই): আগুনঝরা কবি, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং ভারতের নকশাল আন্দোলনের শেষ দিকের উচ্চকিত নেতাদের অন্যতম আজিজুল হক সোমবার কলকাতায় প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলার বামপন্থী উগ্রপন্থার এক রক্তাক্ত ও আলোড়নসৃষ্টিকারী অধ্যায়ের অবসান ঘটল, যা ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে গোটা জাতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
হাওড়ায় ১৯৪২ সালে জন্ম নেওয়া হক সেই প্রজন্মের নকশাল নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, যাঁরা বিশ্বাস করতেন— “বন্দুকের নলই, ক্ষমতার উৎস”— এক মতবাদ যা তাঁদের আদর্শিক পথপ্রদর্শক চারু মজুমদারের হাত ধরে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে জনপ্রিয় হয়েছিল।
একজন কবি, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং সিপিআই(এম-এল)-এর দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন প্রধান হক দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। বাড়িতে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে যাওয়ার পর তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল।
দুপুর ২টা ২৮ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সূত্রের খবর।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স (প্রাক্তন টুইটার)-এ গভীর শোকপ্রকাশ করে লিখেছেন, “আজিজুল হক ছিলেন একজন যোদ্ধা, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনও মাথা নত করেননি।”
“প্রবীণ রাজনীতিবিদ আজিজুল হকের প্রয়াণে আমি গভীর শোকপ্রকাশ করছি। আজিজুল হক ছিলেন এক অনমনীয় লড়াকু নেতা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনও মাথা নত করেননি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও সাথীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই,” তিনি লেখেন।
চারু মজুমদার ও কানাই চ্যাটার্জির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হক ছিলেন সেই কয়েকজন নেতার একজন, যাঁরা রাজ্য দ্বারা দমন হওয়ার পরেও নকশালবাড়ি আন্দোলনের আগুন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
সিপিআই(এম) থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি, কারণ তিনি মজুমদারের চরমপন্থী মতাদর্শ সমর্থন করেছিলেন। পরে নিশীথ ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর তিনি সিপিআই(এম-এল)-এর দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন।
তাঁদের নেতৃত্বে দল ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের গ্রামীণ অঞ্চলে বিপ্লবী সমান্তরাল সরকার গঠনের চেষ্টা করে। তবে পরে রাজ্য সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা হওয়ায় তাঁকেও বহিষ্কার করা হয়।
১৯৭০ সালে পার্বতীপুরম ষড়যন্ত্র মামলায় প্রথমবার গ্রেপ্তার হন তিনি এবং ১৯৭৭ সালে মুক্তি পান।
জীবনের মোট প্রায় ১৮ বছর কারাগারে কাটান হক।
১৯৮২ সালে তাঁর ফের গ্রেপ্তারি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন কারা মন্ত্রীদের মধ্যে দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও যতীন চক্রবর্তী জেল পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর প্যারোলের সুপারিশ করেছিলেন।
তাঁর আত্মজীবনী ‘কারাগারে আঠারো বছর’ নকশাল আন্দোলনের এক সংবেদনশীল, বাস্তব অভিজ্ঞতামূলক দলিল হিসেবে আজও উল্লেখযোগ্য।
তাঁর লেখা ‘নকশালবাড়ি: তিরিশ বছর আগে এবং পরে’ প্রভৃতি গ্রন্থেও চরমপন্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে এলেও তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠানের চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করে গেছেন।
২০০৬ সালে সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় সিপিআই(এম)-এর শিল্পায়ন নীতিকে তিনি সমর্থন জানান, যা নিয়ে তৎকালীন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়।
তিনি প্রায়ই বলতেন, “বামপন্থা মানেই স্রোতের বিপরীতে হাঁটা।” শেষ দিন পর্যন্ত কলম চালিয়ে গেছেন— দৈনিক সংবাদপত্র ও পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন ধারাবাহিকভাবে, বিদ্রোহের রঙ কখনও মলিন হয়নি।
আজিজুল হকের প্রয়াণ শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের প্রয়াণ নয়, এটি বাংলার বিপ্লবী বামপন্থার শেষ এক দীপ্তশিখার নিভে যাওয়া।
অনেকের কাছে ২১ জুলাই ২০২৫ দিনটি চিহ্নিত থাকবে এক বিদ্রোহী চেতনার বিদায়বেলার দিন হিসেবে।
বিভাগ: ব্রেকিং নিউজ
এসইও ট্যাগস: #swadesi, #News, প্রবীণ নকশাল নেতা আজিজুল হক প্রয়াত, বাংলার বাম রাজনীতির এক যুগের অবসান

