বলিউডের সাহিত্য তারকা: ক্যামেরার আড়ালে পাতায় পাতায় ঘোরাফেরা

চমক, গ্ল্যামার আর বক্স অফিসের সংখ্যার বাইরে, অনেক বলিউড তারকা লেখার জগৎকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। উপন্যাস ও কবিতা লেখা থেকে শুরু করে প্রকাশনা সংস্থা চালু করা এবং পাঠাভ্যাস প্রচার পর্যন্ত—অনেক অভিনেতা বছরের পর বছর ধরে তাদের বৌদ্ধিক দিক তুলে ধরেছেন। এখানে হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পের কিছু কম পরিচিত সাহিত্যপ্রেমী তারকার কথা বলা হলো।

শাহরুখ খান: দুনিয়ার সংগ্রাহক

সুপারস্টার শাহরুখ খানের বিশাল ব্যক্তিগত লাইব্রেরি রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার বই রয়েছে—বিশ্বসাহিত্য থেকে দর্শন পর্যন্ত। তাঁর পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা প্রায়ই তাঁর অভিনয়ে ও চরিত্রের গভীরতায় ফুটে ওঠে। তিনি বলেছেন, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এবং আইন র‌্যান্ড পড়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। যদিও তিনি এখনও কোনও বই প্রকাশ করেননি, তিনি স্বীকার করেছেন যে তিনি হাতে লেখা ডায়েরি রাখেন, যেখানে সিনেমা ও জীবনের যাত্রা লিপিবদ্ধ থাকে।

টুইঙ্কল খান্না: অভিনেত্রী থেকে বেস্টসেলার লেখিকা

টুইঙ্কল খান্না, যিনি একসময় পর্দায় জনপ্রিয় মুখ ছিলেন, এখন নিজেকে বুদ্ধিদীপ্ত ও বেস্টসেলার লেখিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। “মিসেস ফানিবোনস” নামে লিখতে শুরু করে, তিনি প্রথমে সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের কলাম লেখেন, যা দ্রুতই বইয়ের চুক্তিতে পরিণত হয়। তাঁর বই Mrs. Funnybones, The Legend of Lakshmi Prasad, এবং Pyjamas Are Forgiving বিক্রির তালিকার শীর্ষে ছিল এবং তীক্ষ্ণ রসবোধ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য প্রশংসিত হয়েছিল। ২০২১ সালে, তিনি Tweak Books নামে একটি ডিজিটাল প্রকাশনা সংস্থা চালু করেন নতুন ভারতীয় লেখকদের উৎসাহিত করার জন্য।

আয়ুষ্মান খুরানা: মাইক্রোফোন হাতে কবি

অপ্রচলিত চলচ্চিত্র বেছে নেওয়ার জন্য পরিচিত আয়ুষ্মান খুরানা শখের দিক থেকেও অনন্য। তিনি একজন আবেগপ্রবণ কবি, প্রায়ই গজল ও হিন্দি-উর্দু কবিতা লেখেন এবং সামাজিক মাধ্যমে ভক্তদের সঙ্গে ভাগ করেন। তাঁর কবিতায় ভালোবাসা, হারানো এবং ক্ষণস্থায়ী খ্যাতি—এই সব বিষয় থাকে। তিনি বলেছেন, একদিন নিজের কবিতা নিয়ে একটি বই প্রকাশ করতে চান। তাঁর সাহিত্য প্রতিভা গান লেখাতেও প্রকাশ পায়, যেমন পানি দা রং, যা তিনি সহ-লিখেছিলেন।

সোহা আলি খান ও করিনা কাপুর খান: কলমধারী বোনেরা

রাজকীয় বোন সোহা আলি খান ও করিনা কাপুর খান দুজনেই লেখালেখিতে হাত লাগিয়েছেন। সোহা লিখেছেন The Perils of Being Moderately Famous নামে একটি হাস্যরসাত্মক আত্মজীবনী, আর করিনা সহ-লিখেছেন Pregnancy Bible, মাতৃত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড। দুটি বইই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে এবং এই দুই বোনকে নগর ভারতীয় নারীদের কাছে সম্পর্কিত কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কাল্কি কোয়েচলিন: চিঠি, কবিতা ও নাটক

ফরাসি-ভারতীয় অভিনেত্রী কাল্কি কোয়েচলিন সিনেমা ও থিয়েটার—দুটিতেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। পর্দার বাইরে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ লেখিকা। তাঁর প্রকাশিত কাজের মধ্যে রয়েছে The Elephant in the Womb, মাতৃত্ব নিয়ে একটি চিত্রিত বই, এবং একাধিক কবিতা, যা সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নাটকও লেখেন, যেগুলির কাহিনী প্রায়ই নারীবাদ, যৌনতা ও আধুনিক নগর জীবনের ওপর ভিত্তি করে। তাঁর বিশ্বাস, লেখা তাঁকে জটিল আবেগ ও চরিত্র বোঝাতে সাহায্য করে।

কবীর বেদী: হলিউড থেকে বলিউডের আত্মজীবনী

অভিজ্ঞ অভিনেতা কবীর বেদী ২০২১ সালে প্রকাশ করেন তাঁর জীবন কাহিনী Stories I Must Tell, যেখানে তিনি তাঁর আন্তর্জাতিক অভিনয়জীবন ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা বলেন। বইটি বেস্টসেলার হয়েছিল এবং এটি ছিল এক আবেগপূর্ণ যাত্রা, যা বলিউড থেকে জেমস বন্ড সিনেমা এবং আবার ফিরে আসার গল্প বলে। এখন তিনি তরুণদের পড়াশোনা উৎসাহিত করতে সময় দেন এবং প্রায়ই সাহিত্য উৎসবে অংশ নেন।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস: বিশ্বজোড়া জীবনে ‘লেখিকা’র সংযোজন

বিশ্বব্যাপী তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস ২০২১ সালে তাঁর আত্মজীবনী Unfinished দিয়ে ভক্তদের চমকে দেন। বইটিতে রয়েছে বেয়ারেলি থেকে হলিউড পর্যন্ত তাঁর যাত্রার গল্প। তিনি বলেছেন, লেখা তাঁর জীবনের অন্যতম আত্মবিশ্লেষণমূলক অভিজ্ঞতা ছিল। বইটির সাফল্যের পরে শোনা যাচ্ছে, তিনি দ্বিতীয় বই লেখার কথা ভাবছেন, যেখানে তাঁর উদ্যোক্তা জীবন ও সমাজসেবার কথা থাকবে।

বলিউডে বাড়ছে পড়ার সংস্কৃতি

সোশ্যাল মিডিয়ায় বইয়ের ক্লাব ও তারকাদের সুপারিশের মাধ্যমে, বলিউড তারকারা এখন পাঠাভ্যাস প্রচারে তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। বিদ্যা বালান, সোনম কাপুর আহুজা ও হৃতিক রোশন প্রায়ই তাদের পড়াশোনার অভ্যাস নিয়ে কথা বলেন। এখন অভিনেতাদের জয়পুর লিটারেচার ফেস্টিভাল ও লেখক মিলনমেলায় দেখা অস্বাভাবিক নয়।

বক্স অফিসের বাইরে, বইয়ের তাকের দিকে

যেখানে দর্শক অভিনেতাদের ব্লকবাস্টার সিনেমার জন্য চেনে, সেখানে অনেক বলিউড তারকা নীরবে ভারতের পাঠাভ্যাসকে সমৃদ্ধ করছেন। তা হোক হাস্যরসাত্মক আত্মজীবনী, আবেগময় কবিতা কিংবা ব্যক্তিগত লাইব্রেরি—এই তারকারা তারকাখ্যাতিকে শুধু পর্দায় নয়, কাগজেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন। স্ক্রিন টাইমে ভরা এক দুনিয়ায়, বলিউডের এই বইপ্রেমীরা ধীরে ধীরে ভক্তদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন—সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার এখনও বইয়ের পাতায় লুকিয়ে আছে।

— সোনালি